আপনি কী করেন? — নিজেকে চেনার শুরু

গত মাসে এক বিয়ের অনুষ্ঠানে গিয়েছিলাম। খাবারের টেবিলে বসেছি, প্লেটে বিরিয়ানি নিয়েছি সবে, এমন সময় পাশের চেয়ারের এক ভদ্রমহিলা হেসে জিজ্ঞেস করলেন, “আপনি কী করেন?”

খুব সাধারণ প্রশ্ন, তাই না? আমরা রোজ শুনি। কেউ নতুন পরিচয় হলেই এই প্রশ্নটা আসে। আমিও অভ্যাসমতো উত্তর দিয়ে দিলাম; আমার কাজের নামটা বললাম। উনি মাথা নাড়লেন, “ও আচ্ছা”, তারপর অন্য কথায় চলে গেলেন। কিন্তু আমার ভেতরে কিছু একটা খচখচ করতে থাকল।

কারণ প্রশ্নটা ছিল “আপনি কী করেন?”, আর আমি উত্তর দিয়েছিলাম আমি কী “হই”। আমি একটা কাজের কথা বলিনি; আমি একটা পরিচয়ের কথা বলেছি। যেন আমার পুরো মানুষটা ওই এক লাইনের ভেতর ধরা পড়ে যায়।

আপনি একটু খেয়াল করে দেখুন। কেউ যখন জিজ্ঞেস করে “আপনি কী করেন?”, তখন আপনি কী বলেন? আপনি বলেন আপনার পদবি। কিংবা বলেন আপনি একজন মা, একজন গৃহিণী, একজন ছাত্রী, একজন চাকরিজীবী। আমরা সবাই এভাবেই উত্তর দিই। ছোটবেলা থেকেই আমাদের শেখানো হয়েছে, নিজের পরিচয় মানে নিজের ভূমিকার নাম।

কিন্তু ভাবুন তো, ওই ভূমিকাটা যদি একদিন সরে যায়? চাকরিটা যদি না থাকে? সন্তান যদি বড় হয়ে দূরে চলে যায়? ছাত্রজীবন যদি শেষ হয়ে যায়? তখন আপনি কে? প্রশ্নটা কঠিন, কিন্তু জরুরি।

আমার এক পরিচিত আছেন। সারাজীবন উনি ব্যাংকে চাকরি করেছেন। খুব গর্ব করে বলতেন উনি কোন পদে আছেন, কোন শাখায় বসেন। রিটায়ারমেন্টের পর প্রথম কয়েক মাস উনি রীতিমতো অসুস্থ হয়ে পড়েছিলেন। শরীরের অসুখ না; মনের। উনি বলতেন, “আমি এখন কে বলো তো? সকালে উঠে যাওয়ার জায়গা নেই, কেউ আর স্যার বলে ডাকে না।” পুরো একটা মানুষ, চল্লিশ বছরের অভিজ্ঞতা, একটা পুরো জীবন; কিন্তু নিজেকে চেনার জন্য উনার হাতে শুধু ছিল একটা পদবি। পদবিটা চলে যেতেই উনি নিজেকে হারিয়ে ফেললেন।

এই জায়গাটায় আমি অনেকদিন আটকে ছিলাম, সত্যি বলছি। আমিও একসময় নিজের পরিচয় বলতে গিয়ে শুধু কাজের কথা বলতাম। কেউ জিজ্ঞেস করলে গড়গড় করে বলে দিতাম আমি কী করি, কোথায় কাজ করি, কতটা ব্যস্ত থাকি। ভেতরে ভেতরে ভাবতাম, এই ব্যস্ততাই বুঝি আমার মূল্য। যেদিন কাজ কম থাকত, সেদিন কেমন একটা অপরাধবোধ হতো; মনে হতো আমি বুঝি ফাঁকা হয়ে গেছি।

একদিন আমার এক বান্ধবী, অনেক পুরনো, স্কুলজীবনের; সে আমাকে জিজ্ঞেস করল, “তোর কাজ বাদ দে। তুই আসলে কেমন মানুষ, সেটা বল।” আমি থমকে গেলাম। কী বলব বুঝতে পারছিলাম না। আমার হাতে কাজের নাম ছিল, কিন্তু মানুষটার বর্ণনা ছিল না। আমি কী পছন্দ করি, কীসে আমার আনন্দ, কী দেখলে আমার চোখে পানি আসে, কোন অন্যায়ে আমার রাগ হয়; এসব নিয়ে ভাবার সময়ই আমি পাইনি এতদিন। আমি এত ব্যস্ত ছিলাম “কী করি” তা নিয়ে যে “কে আছি” সেটা ভুলে গিয়েছিলাম।

সেদিন বাসায় ফিরে আমি একটা কাগজ নিয়ে বসেছিলাম। ভেবেছিলাম নিজের সম্পর্কে দশটা কথা লিখব, যার একটাতেও আমার কাজের নাম থাকবে না। প্রথম কথাটা লিখতেই আমার আধা ঘণ্টা লেগে গেল! এতটা অচেনা ছিলাম নিজের কাছে।

আমি বলছি না কাজের পরিচয় খারাপ। মোটেও না। যিনি রিকশা চালান, তিনি সৎভাবে রোজগার করেন, এটা সম্মানের কথা। যিনি সংসার সামলান, তিনি একটা পুরো পৃথিবী চালান। কাজ আমাদের বাঁচায়, আমাদের মর্যাদা দেয়। কিন্তু কাজটা আমাদের একটা অংশ; পুরোটা না। সমস্যা তখনই হয়, যখন আমরা অংশটাকে গোটা ভেবে বসি।

আপনি যদি শুধু আপনার ভূমিকা দিয়ে নিজেকে চেনেন, তাহলে ভূমিকা বদলালেই আপনি হারিয়ে যাবেন। কিন্তু আপনি যদি জানেন আপনার ভেতরের মানুষটা কে, তাহলে যত ঝড়ই আসুক, আপনি নিজের কাছে থেকে যাবেন।

আজ একটা ছোট্ট কথা রেখে যাই। পরেরবার কেউ যখন আপনাকে জিজ্ঞেস করবে “আপনি কী করেন?”, তখন মুখে যা-ই বলুন, মনে মনে নিজেকে আরেকটা প্রশ্ন করুন; “কাজের নামটা সরিয়ে রাখলে, আমি আসলে কে?” উত্তরটা আজ না-ও আসতে পারে। ঠিক আছে। প্রশ্নটা মনে জেগে থাকাই আপাতত যথেষ্ট। নিজেকে চেনার যাত্রা তো এখান থেকেই শুরু হয়।