সন্ধ্যাবেলার একটা দৃশ্য ভাবুন। এক মা রান্নাঘরে দাঁড়িয়ে আছেন। এক হাতে খুন্তি, চুলায় তরকারি বসানো। কানে মোবাইল, অফিসের বসের সাথে কথা বলছেন। পাশে দাঁড়িয়ে ছোট ছেলে ঘ্যানঘ্যান করছে, ওর স্কুলের ব্যাগ খুঁজে পাচ্ছে না। ঘরের আরেক কোণ থেকে শাশুড়ি ডাকছেন, ওষুধ দেওয়ার সময় হয়েছে। দরজায় কলিংবেল বাজছে, কাজের বুয়া এসেছে।
একটা শরীর, একসাথে চারটা ভূমিকা। মা, বউমা, কর্মচারী, গৃহিণী। উনি সব সামলাচ্ছেন। বাইরে থেকে দেখলে মনে হবে সবকিছু ঠিকঠাক চলছে।
কিন্তু ওই মানুষটার ভেতরে, ওই সব ভূমিকার নিচে, একজন মানুষ বসে আছে। যার হয়তো আজ মন খারাপ। যে হয়তো ভীষণ ক্লান্ত। যার হয়তো ইচ্ছে করছে দশ মিনিট চুপচাপ ছাদে দাঁড়িয়ে থাকতে, কিছু না করে। কিন্তু সেই মানুষটার দিকে কেউ তাকায় না; এমনকি মানুষটা নিজেও না।
এটাই সেই ফাঁক। আমরা যে ভূমিকাগুলো পালন করি, আর ভূমিকার নিচে যে আসল মানুষটা থাকে; এই দুইয়ের মাঝখানে একটা দূরত্ব তৈরি হয়ে যায়। আর যত দিন যায়, দূরত্বটা তত বাড়ে।
আমি এই ফাঁকটা টের পেয়েছিলাম একদিন খুব অদ্ভুতভাবে। একটা বিয়েবাড়ি থেকে ফিরছিলাম রিকশায়। সারাদিন হাসিমুখে সবার সাথে কথা বলেছি, সবার খোঁজখবর নিয়েছি; ভালো মেয়ে, ভালো আত্মীয়, সবাই খুশি। রিকশায় উঠে হঠাৎ চুপ হয়ে গেলাম। রাস্তার বাতিগুলো পেছনে সরে যাচ্ছে, বাতাস লাগছে মুখে। তখন হঠাৎ আমার মনে হলো, “আজ সারাদিন আমি এত মানুষের খোঁজ নিলাম; আমার নিজের খোঁজ কে নিল?”
কথাটা মনে হতেই আমার চোখে পানি এসে গেল। কেন এল, আমি নিজেও জানি না। শুধু বুঝলাম, ভেতরের ওই মানুষটা অনেকদিন ধরে অপেক্ষা করছিল; শুধু একটু মনোযোগের জন্য। আমি সবাইকে সময় দিয়েছি, শুধু নিজেকে দিইনি।
আমরা মেয়েরা এই জিনিসটা খুব করি, তাই না? আমাদের শেখানো হয় আমরা যেন সবার জন্য থাকি। মায়ের মেয়ে হয়ে, স্বামীর স্ত্রী হয়ে, সন্তানের মা হয়ে, অফিসের কর্মী হয়ে; আমরা নিজেদের এত ভাগ করে ফেলি যে নিজের জন্য আর কিছু বাঁচে না। প্রতিটা ভূমিকায় আমরা সেরাটা দিতে চাই, আর নিজের মানুষটাকে সবার শেষে রাখি। বেশিরভাগ সময় তো সেই তালিকায় আমাদের নামটা আসেই না।
কিন্তু একটা কথা মনে রাখবেন। ভূমিকা হলো পোশাকের মতো। সকালে আমরা একেকটা পরি, রাতে খুলে রাখি। আপনি একটা শাড়ি পরলেই যেমন শাড়িটা আপনি হয়ে যান না, তেমনি আপনি একটা ভূমিকা পালন করলেই সেই ভূমিকাটা পুরো আপনি হয়ে যায় না। পোশাকের নিচে যে শরীর, ভূমিকার নিচে সেই মানুষটাই আসল।
সমস্যা হলো, আমরা এতদিন ধরে এত ভূমিকা পরে থাকি যে এক সময় ভুলে যাই নিচে আসলে কে আছে। কেউ যদি জিজ্ঞেস করে, “সব দায়িত্ব বাদ দিলে আপনি কী চান?”, আমরা থমকে যাই। কারণ নিজের চাওয়াটা আমরা চাপা দিতে দিতে ভুলেই গেছি।
আমি বলছি না ভূমিকা ছেড়ে দিন। সংসার আছে, দায়িত্ব আছে, ভালোবাসার মানুষ আছে; এগুলো আমাদের জীবন। কিন্তু দিনের ভেতর অন্তত একটু সময় বের করুন, যখন আপনি কোনো ভূমিকায় নেই। যখন আপনি কারো মা না, কারো বউ না, কারো কর্মী না; শুধু আপনি। শুধু নিজের সাথে।
সেই সময়টায় নিজেকে একটা সহজ প্রশ্ন করতে পারেন, “আজ ভেতরের মানুষটা কেমন আছে?” খুব ছোট প্রশ্ন। কিন্তু এই প্রশ্নটাই ফাঁকটা ভরাট করা শুরু করে। ভূমিকা আর মানুষটা, দুটোকে আবার কাছাকাছি নিয়ে আসে।
আপনি সবার খেয়াল রাখেন, আমি জানি। আজ একটু নিজের খেয়ালও রাখুন। ভেতরের মানুষটা অনেকদিন অপেক্ষা করছে।
