আপনি কখনো খেয়াল করেছেন, আমরা নিজেদের সম্পর্কে যা যা বিশ্বাস করি, তার বেশিরভাগই আসলে আমাদের নিজের কথা না?
একটু অদ্ভুত শোনাচ্ছে, জানি। কিন্তু ভেবে দেখুন।
আমার এক প্রতিবেশী আছেন, ছোট্ট একটা মেয়ে; বয়স বড়জোর সাত। সেদিন উঠানে খেলছিল, আমি পাশ দিয়ে যাচ্ছি। ওর মা রান্নাঘর থেকে চেঁচিয়ে বললেন, “এই মেয়ে তো ভীষণ লাজুক, কারো সাথে কথাই বলে না।” মেয়েটা তখন হাসছিল, দৌড়াচ্ছিল, দিব্যি খেলছিল। কিন্তু মায়ের কথাটা শুনে ও হঠাৎ থমকে গেল; একটু জড়সড় হয়ে গেল। আমি নিশ্চিত, আজ থেকে দশ বছর পর ওই মেয়েটা নিজের সম্পর্কে বলবে, “আমি একটু লাজুক টাইপের।” অথচ কথাটা ওর নিজের আবিষ্কার না; ওর মায়ের দেওয়া একটা লেবেল।
আমরা সবাই এভাবেই বড় হয়েছি। ছোটবেলায় বাবা হয়তো বলেছিলেন, “এই ছেলেটা অঙ্কে কাঁচা।” ব্যস, আপনি সারাজীবন বিশ্বাস করে গেলেন আপনি অঙ্কে পারেন না। স্কুলের এক শিক্ষক হয়তো একদিন রাগ করে বলেছিলেন, “তোমাকে দিয়ে কিচ্ছু হবে না।” সেই একটা বাক্য আপনার বুকে গেঁথে গেল, বছরের পর বছর।
শাশুড়ি হয়তো বিয়ের পর বলেছিলেন, “বউমা তো সংসারের কিছুই বোঝে না।” আপনি হয়তো তখন নতুন, ভয়ে ভয়ে থাকেন; আর ওই কথাটা মেনে নিলেন। কলিগ হয়তো একদিন মিটিংয়ে বলল, “ও তো একটু ধীরগতির।” আপনি নিজেকে ধীরগতির ভাবতে শুরু করলেন।
এভাবে টুকরো টুকরো করে আমাদের একটা ছবি তৈরি হয়। কিন্তু ছবিটা কে আঁকল? আমরা না। এঁকেছে বাবা, মা, শিক্ষক, শাশুড়ি, কলিগ, পাড়ার লোক। আমরা শুধু ফ্রেমে বাঁধিয়ে দেয়ালে টাঙিয়ে রাখলাম, আর সারাজীবন ভাবলাম এটাই আমি।
আমার নিজের কথা বলি। আমি অনেক বছর বিশ্বাস করতাম আমি রাগী মানুষ। আমার ছোটবেলায় বাসায় সবাই বলত, “লায়লার তো ভীষণ রাগ, একটুতেই ফেটে পড়ে।” আমি ধরেই নিয়েছিলাম এটা আমার স্বভাব, এটা বদলাবে না। কতবার নিজেকে দোষ দিয়েছি, কতবার ভেবেছি আমি বুঝি খারাপ মানুষ।
তারপর একদিন, অনেক বড় হয়ে, আমি একটু থেমে ভাবলাম। আমি কি সত্যিই সবসময় রাগী? না তো! আমি তো তখনই রাগি, যখন কেউ আমার সাথে অন্যায় করে, কিংবা আমার কথা কেউ শোনে না। আসলে ব্যাপারটা রাগ না; আমার ভেতরে ন্যায়ের একটা বোধ ছিল, আর নিজের কথা বলার একটা তাগিদ ছিল। ছোটবেলায় বাসার লোকজন সেটাকে সহজ করে “রাগ” নাম দিয়ে দিয়েছিল। কারণ একটা মেয়ে চুপ করে থাকবে, এটাই তো নিয়ম ছিল। আমি চুপ থাকতাম না, তাই আমি “রাগী”।
সেদিন আমার মনে হলো, আমি এতদিন অন্যের দেওয়া একটা ভুল নাম বয়ে বেড়িয়েছি। লেবেলটা আমার না, তবুও আমি সেটাকে আমার ভেবে বসে ছিলাম।
আপনার ভেতরেও এমন কিছু কথা আছে, আমি নিশ্চিত। এমন কিছু বিশ্বাস, যেগুলো আপনি কখনো যাচাই করে দেখেননি; শুধু মেনে নিয়েছেন। “আমি ভীতু”, “আমি বোকা”, “আমাকে দিয়ে হবে না”, “আমি সুন্দর না”, “আমি গুছিয়ে কথা বলতে পারি না”; এই কথাগুলোর কোনটা আপনার নিজের আবিষ্কার, আর কোনটা কারো দেওয়া?
আজ একটা কাজ করে দেখতে পারেন। নিজের সম্পর্কে যে কথাগুলো আপনি বিশ্বাস করেন, তার একটা বেছে নিন; বিশেষ করে খারাপ কথাটা। তারপর নিজেকে জিজ্ঞেস করুন, “এই কথাটা আমি প্রথম কার মুখে শুনেছিলাম?” অনেক সময় দেখবেন, একটা মুখ ভেসে ওঠে। একটা কণ্ঠস্বর মনে পড়ে। তখন বুঝবেন, এটা আপনার সত্যি না; এটা কারো একটা পুরনো মন্তব্য, যেটা আপনি আঁকড়ে ধরে রেখেছেন।
নিজেকে চেনার প্রথম কাজটা হলো, কোনটা আপনার নিজের আর কোনটা ধার করা, সেটা আলাদা করা। ধার করা জিনিস তো একদিন ফেরত দেওয়া যায়। যে কথাগুলো আপনার না, সেগুলো আপনি নামিয়ে রাখতে পারেন। ভার কমবে, দেখবেন। নিঃশ্বাসটা একটু হালকা হবে।
